পবিত্র মক্কা নগরী ও কাবা শরিফের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

পবিত্র কাবা শরীফ বা বায়তুল্লাহ (আল্লাহর ঘর) হলো সারা বিশ্বের মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীক এবং ইবাদতের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। মরুর তপ্ত বালুকারাশির মাঝে  যেন এক খণ্ড জান্নাতি সুষমা। ধূসর পাহাড়ের বুক চিরে জেগে ওঠা মক্কা নগরীর হৃদপিণ্ড হলো পবিত্র কাবা শরীফ। এটি কেবল একটি পাথরের স্থাপত্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মুমিনের হৃদয়ের স্পন্দন এবং একত্বের আলোকবর্তিকা। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি এই কালচে গিলাফে ঢাকা ঘনকাকৃতির ঘরটি মানুষকে শেখায় সাম্য, ভ্রাতৃত্ব আর মহান স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের হাতের ছোঁয়ায় ধন্য এই আঙিনা আজও বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে একই সুতোয় গেঁথে রাখে।

কাবা, যে নাম শুনে আন্দোলিত হয় প্রতিটি হৃদয়। যার ভালোবাসায় পাগল প্রায় প্রতিটি মোমেন মন। যে ভালোবাসার শিকড় গ্রোথিত মোমেন হৃদয়ের গহিন। মোমেন মাত্রই কাবা জিয়ারতের স্বপ্ন লালন করেন মনে। এ ঘর ছুঁয়ে দেখার এক-অপার্থিব টান অনুভব করেন হৃদয় মাজারে। যার আলোচনা ও ইতিহাস মোমেন হৃদয়ে কম্পনের সৃষ্টি করে। যার ঘটনা শুনে যায় অপলক নয়নে। যার ইতিহাস-ঐতিহ্যে বিমোহিত হয় শরীর, মন ও প্রাণ। আসুন, ইখবারু মক্কা কিতাবের আলোকে জেনে নিই কাবা নির্মাণের আদি-অন্ত ইতিহাস।

ফেরেশতা কর্তৃক কাবা নির্মাণ

সর্বপ্রথম আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা এ ঘর নির্মাণের সৌভাগ্য অর্জন করেন। মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে হুসাইন রা: বর্ণনা করেন, আমি আমার পিতা আলি ইবনে হুসাইনের সাথে মক্কায় কাবা তাওয়াফে রত ছিলাম। এমতাবস্থায় দীর্ঘকায় এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হলেন এবং বাবার কাঁধে হাত রাখলেন। বাবা তার দিকে তাকালে, তিনি সালাম দিলেন এবং বললেন, হে রাসূল তনয়ার ছেলে আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। বাবা তাওয়াফ সম্পন্ন করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে বললেন, কী জিজ্ঞাসা করতে চাও? তিনি বললেন, আমি এই ঘরের তাওয়াফের সূচনা সম্পর্কে জানতে চাই। জানতে চাই তা কেন করা হয়? কীভাবে এবং কখন থেকে করা হয়? বাবা প্রশ্ন করলেন, তুমি কোথা থেকে এসেছ? তিনি বললেন, শাম থেকে। বাবা বললেন, শামের কোন এলাকায় তোমার বাসা?

লোকটি বললেন, বাইতুল মুকাদ্দাসে। বাবা বললেন, তুমি তাওরাত এবং জাবুর কিতাবদ্বয় পড়েছ কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বাবা বললেন, হে শামি ভাই! মনে রেখো, আমার সাথে সত্য বৈ মিথ্যা বলবে না। শুনে রেখ, এ ঘরের তাওয়াফের সূচনা হয়, যখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেছিলেন, আমি পৃথিবীতে আমার খলিফা-প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে চাই। (সূরা বাকারা-৩০) উত্তরে ফেরেশতারা বলেছিলেন, হে রব! আমাদের ছাড়াও কী আপনি এমন প্রতিনিধি সৃষ্টি করবেন, যারা সেখানে ফাসাদ করবে। রক্তারক্তি করবে। হিংসা-বিদ্বেষ করবে? হে রব! আপনি আমাদেরকেই আপনার খলিফা মনোনীত করুন। আমরা রক্তারক্তি, হিংসা-বিদ্বেষ কিছুই করব না। তখন আল্লাহ বলেছিলেন- ‘নিশ্চয়ই আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।’ (সূরা বাকারা-৩০)

আল্লাহর এমন জবাবে ফেরেশতারা ধারণা করলেন, তারা যা বলেছে তা আল্লাহর বিরুদ্ধে হয়েছে এবং আল্লাহ তাদের প্রতি রাগান্বিত হয়েছেন। তখন তারা আরশের নিচে আশ্রয় নিলেন। নিজেদের মাথা উপরের দিকে উত্তোলন করলেন এবং আল্লাহর কাছে অনুনয়-বিনয় করে কাঁদতে লাগলেন তাঁর দয়া ও ক্ষমার আশায়। সে সময় তারা তিনবার আরশের তাওয়াফ করেন। আল্লাহ তাদের প্রতি তাকালেন এবং দয়া করলেন। আরশকে কেন্দ্র করে তাদের কৃত তাওয়াফ আল্লাহর পছন্দ হয় এবং তিনি আরশের নিচে চার খুঁটিবিশিষ্ট যবরজদ পাথরের দ্বারা একটি ঘর নির্মাণ করেন এবং লাল ইয়াকুত দ্বারা তা ঢেকে দেন। অতপর ফেরেশতাদের আদেশ করেন, তোমরা এই ঘরের তাওয়াফ করো। সেই ঘরটিই হলো বায়তুল মামুর। যা প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা তাওয়াফ করেন। এরপর, তিনি ফেরেশতাদের আদেশ করলেন এই পরিমাপের একটি ঘর পৃথিবীর বাসিন্দাদের জন্য তৈরি করো। যাতে পৃথিবীর বাসিন্দারা সেখানে তাওয়াফ করতে পারে। এটি শুনে ওই ব্যক্তি বললেন, সত্য বলেছেন, হে রাসূল তনয়ার ছেলে। (ইখবারু মাক্কা-৩২)

আদম আ: কর্তৃক কাবা নির্মাণ

হজরত ইবনে আব্বাস রা: বলেন, আদম আ: প্রথম মানুষ যিনি কাবা নির্মাণ করেন এবং সেখানে নামাজ পড়েন। (ইখবারু মাক্কা-৪০) ইবনে আব্বাস রা: বলেন, আদম আ: দুনিয়াতে এসে আল্লাহর ক্ষমা লাভে ধন্য হলে, তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমি ফেরেশতাদের আওয়াজ শুনতে পাই না। তাদের অনুভবও করতে পারি না। আল্লাহ বললেন- ‘তা তোমার অপরাধের কারণে। তবে তুমি যাও এবং আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করো। তার তাওয়াফ করো। তার পাশে আমাকে স্মরণ করো। যেমনটি তুমি ফেরেশতাদের করতে দেখেছ আরশের পাশে। আদম আ: কাবা নির্মাণ শুরু করলে, জিবরাইল আ: স্বীয় পাখা দ্বারা জমিনে প্রহার করেন। যার কারণে সপ্ত জমিনের নিচের ভিত্তি প্রকাশ পায়। ফেরেশতাদের সাহায্যে আদম আ: লুবনান, তুরে সিনা, তুরে জাইতা, জুদি ও হেরাসহ পাঁচ পাহাড়ের পাথর দ্বারা কাবার নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন। (ইখবারু মাক্কা-৩৬)

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ আদম আ: এর তাওবাহ কবুল করে মক্কায় যাওয়ার আদেশ করেন। যেহেতু আদম আ: হিন্দুস্থানের সিংহল-শ্রীলঙ্কায় অবতরণ করেছিলেন। সেহেতু, আল্লাহ জমিনকে সঙ্কীর্ণ করে দেন এবং সাগর, নদী, সমুদ্র ও সাগর-মহাসাগরকে শুকিয়ে দেন। ইতোপূর্বে তিনি আল্লাহর ক্ষমা লাভের জন্য অনেক ক্রন্দন করেছিলেন। তাকে সান্ত্বনা দানের নিমিত্তে আল্লাহ জান্নাতি একটি তাঁবু তাকে দান করেন। তিনি সেটিকে মক্কায় কাবার স্থানে স্থাপন করেন। তাঁবুটি জান্নাতের লাল ইয়াকুতের ছিল। তাতে স্বর্ণের তিনটি বাতি ছিল। তার সাথে হাজরে আসওয়াদকেও নাজিল করা হয়েছিল। সাথে একটি চেয়ারও ছিল, যেটিতে আদম আ: বসতেন। (ইখবারু মাক্কা-৩৭)

ইতিহাসের সূচনালগ্নেই কাবা ঘরের প্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয় নবী আদম আ.-এর হাতে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে পৃথিবীতে পাঠানোর পর ইবাদতের জন্য একটি ঘর তৈরির নির্দেশ দেন, যাতে তিনি আল্লাহর বন্দেগিতে সময় কাটাতে পারেন। ফেরেশতারা বায়তুল মামুর (আসমানের কাবা)-এর অনুকরণে পৃথিবীতে এর স্থান নির্ধারণ করে দেন।

তখন আদম আ. ও তাঁর বংশধররা সেখানে নামাজ আদায় করতেন, কাবা ঘরের চারপাশে তাওয়াফ করতেন। সময়ের সঙ্গে বন্যা ও প্রাকৃতিক কারণে ঘরটি বিলুপ্ত হয়ে যায়, কিন্তু তার পবিত্র অবস্থান অটুট থাকে।

নবী নূহ আ.-এর যুগে পৃথিবী এক ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছিল। মানুষ তখন আল্লাহর পথে থেকে বিচ্যুত হয়ে বহু মূর্তি ও মিথ্যা দেবতার উপাসনা শুরু করেছিল। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে শাস্তি দিতে মহাপ্লাবন বা “নূহের বন্যা” প্রেরণ করেন—যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক মহা বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত।

এই মহাপ্লাবনের জলোচ্ছ্বাসে তৎকালীন কাবা ঘরের কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। পাহাড়সম ঢেউ মক্কার ভূমিও গ্রাস করে নেয়। মানুষের বসতি, ইবাদতের স্থান—সবই পানির নিচে বিলীন হয়ে যায়। কাবা ঘরের মূল ভিত্তি মাটির নিচে চাপা পড়ে, কেবল একটি পবিত্র স্থানের স্মৃতি রয়ে যায় আল্লাহর হেফাজতে।

দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ কাবা ঘরের অবস্থান ভুলে যায়। পৃথিবীতে বহু নবী ও জাতি আসে, কিন্তু কাবার অবস্থান কেউ নির্ধারণ করতে পারে না। তবুও আল্লাহ তায়ালা সেই স্থানকে বিলুপ্ত হতে দেননি; তা তাঁর বিশেষ কুদরতে সংরক্ষিত ছিল পৃথিবীর মানচিত্রে।

বলা হয়, বন্যা শেষে যেখানে কাবা ঘর ছিল, সেখানে একটি উঁচু পাহাড়ি চিহ্ন দৃশ্যমান ছিল—যা “বাইতুল আতীক”-এর স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল প্রাচীন আরবদের কাছে। এই পবিত্র স্থানের চিহ্নই পরবর্তীকালে নবী ইব্রাহিম আ.-এর মাধ্যমে আবার আলোকিত হয়, যখন আল্লাহ তাঁকে সেই জায়গায় কাবা ঘর পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন।

নবী ইব্রাহিম আ. পাথর দিয়ে ঘরটির ভিত্তি নির্মাণ করেন এবং নবী ইসমাইল আ. তাঁকে সহায়তা করেন। ঘরটি ছিল সরল কিন্তু দৃঢ় কাঠামোর, ছাদবিহীন এবং প্রায় নয় কিউবিট উঁচু। কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে তাঁরা স্থাপন করেন হাজরে আসওয়াদ (কৃষ্ণপাথর) — যা জান্নাত থেকে প্রেরিত বলে বিশ্বাস করা হয়। এই পাথরটি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হলেও তার মূল পবিত্রতা অটুট রয়েছে।

নবী ইব্রাহিম আ. নির্মাণ শেষে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন

“ হে আমাদের পালনকর্তা! আমি আমার বংশধরদের মধ্যে কতককে তোমার পবিত্র গৃহের নিকট চাষাবাদহীন উপত্যকায় বসবাস করালাম, হে আমাদের পালনকর্তা, যাতে তারা নামায কায়েম করে ।”

এই দোয়ার মধ্য দিয়েই কাবা ঘর পৃথিবীর ইবাদতের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

নবী ইব্রাহিম আ. ও ইসমাইল আ.-এর হাতে নির্মিত এই ঘর আজও কোটি মানুষের হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটায়—যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ আল্লাহর সামনে চোখের পানি ফেলে, ক্ষমা চায় এবং তাওহীদের চিরন্তন বার্তা স্মরণ করে।

প্রতিবছর লাখ লাখ মুসলমান কাবাঘর তাওয়াফ করতে মক্কা গমন করেন। “আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বাইতুলল্লাহর স্থানকে সমগ্র ভুপৃষ্ঠ থেকে দু’হাজার বছর আগে সৃষ্টি করেন” মুসলিম শরিফের একটি হাদিসে হযরত আবুযর গিফারী হতে বর্ণনা হয়েছে, রাসূল (সঃ) তার একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “বিশ্বের সর্বপ্রথম মসজিদ হলো মসজিদে হারাম। এরপরের মসজিদ হলো মসজিদে আকসা। মসজিদে হারাম নির্মাণে ৪০ বছর পর মসজিদে আকসা নির্মিত হয়”।

আদম সন্তান শীষ কর্তৃক কাবা নির্মাণ

হজরত ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, হজরত আদম আ:-এর মৃত্যুর সাথে সাথে জান্নাতি তাঁবুটি আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়। তখন আদমের সন্তানরা বিশেষত শীষ আ: সেই স্থানে মাটি পাথরের কাবাঘর নির্মাণ করেন। পরবর্তী প্রজন্মও তা জারি রাখেন, যা নুহ আ:-এর প্লাবন পর্যন্ত ছিল। প্লাবনে অন্যান্য সব কিছুর সাথে কাবাঘরটিও ধ্বংস হয়ে যায়। (ইখবারু মাক্কা-৫১)

ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) কর্তৃক কাবা নির্মাণ

নূহের প্লাবনে কাবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বহু বছর পর আল্লাহ ইব্রাহিমকে আদেশ করেন স্বীয় ছেলে ইসমাইলকে সাথে নিয়ে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করতে। তিনি আল্লাহকে জিজ্ঞাসা করলেন, কাবার স্থান চিনব কীভাবে? তখন আল্লাহ মাথাবিশিষ্ট একটি মেঘখণ্ড প্রেরণ করেন। সেই মেঘখণ্ড আওয়াজ দেয়, হে ইব্রাহিম! আপনার রব আদেশ করেছেন, এই স্থানে আমার বরাবর কাবা নির্মাণ করতে। (ইখবারু মক্কা-৬০)

আমালেকা সম্প্রদায় কর্তৃক কাবা নির্মাণ

হজরত ইবরাহিম আ: কর্তৃক তৈরিকৃত কাবা ভেঙে গেলে আমালেকা সম্প্রদায় তা পুনর্নির্মাণ করেন। (হারামাইনের ইতিহাস-৬১)

জুরহাম সম্প্রদায় কর্তৃক কাবা নির্মাণ

আমালেকা সম্প্রদায়ের বানানো কাবা ভেঙে গেলে হজরত ইসমাইল আ:-এর শ্বশুর গোষ্ঠী জুরহাম গোত্র কাবাঘর আবার নির্মাণ করে। (ইখবারু মাক্কা-৬১)

কুরাইশ সম্প্রদায় কর্তৃক কাবা নির্মাণ

ইবনে আবি নাজিহ স্বীয় পিতা থেকে বর্ণনা করেন, কুরাইশের কিছু লোক মসজিদে হারামে বসা ছিলেন। যাদের মধ্যে হুয়াইতিব ইবনে আব্দুল উজ্জা ও মাখরামা ইবনে নওফেলও ছিলেন। সেখানে কুরাইশরা কাবা নির্মাণ করতে গিয়ে কী কী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল তার পর্যালোচনা করেন। আগে কাবা কেমন ছিল সে কথাও তারা উল্লেখ করেন। তারা বলেন, আগে কাবাঘর সাদা-স্বচ্ছ শুষ্ক পাথরের তৈরি ছিল। যাতে কোনো কাদা ছিল না। তখন তার দরজা ছিল মাটির। ওপরে ছাদ ছিল না। দেয়ালগুলোতে কাপড় ঝুলানো ছিল। যা কাবার ভেতর থেকে বাঁধা ছিল। কাবার ভেতরে ডান পার্শ্বে একটি গর্ত ছিল। যাতে কাবার সম্পদ, উপঢৌকন রূপে পাওয়া স্বর্ণ-রৌপ্য ইত্যাদি খাজানা আকারে রাখা হতো। সেই গর্তে একটি সাপ থাকত যা জুরহাম গোত্রের সময় থেকে তা পাহারা দিচ্ছিল। কারণ ইতোপূর্বে দু’বার কাবার সম্পদ চুরি হয়েছিল। কাবার ভেতরের দেয়ালে ইবরাহিম আ:-এর জবাইকৃত দুম্বাটির সিং লটকানো ছিল। অন্যান্য আরো অনেক স্বর্ণালঙ্কার ঝুলানো ছিল।

একবার কাবার পার্শ্বে এক মহিলাকে প্রস্তরাঘাত করা হয়। সেখানের সৃষ্ট আগুন কাবার কাপড়ে লেগে যায় এবং নিমিষেই গোটা কাবা পুড়ে যায়। কাবা পুড়ে গেলে তার দেয়ালগুলো আরো দুর্বল হয়ে যায়। সেই বছরেই মক্কায় প্রবল বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পানি কাবায় ঢুকে দেয়াল ভেঙে বের হয়ে যায়। যার কারণে কোরাইশরা আরো ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা কাবা ভেঙে পুনর্নির্মাণের ইচ্ছা করে। তবে তারা এ ক্ষেত্রে ভয়ও পাচ্ছিল, না জানি এর কারণে কোনো শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। ঘটনাক্রমে সেই সময় রোমানের একটি নৌকা মক্কার ঘাটে ভেঙে যায়। কোরাইশরা তা শুনে ভাঙা নৌকার কাঠগুলো কিনে নেয় এবং তা দ্বারা কাবা নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মক্কার সবাই মিলে কাবা নির্মাণের সব আসবাবপত্র একত্রিত করে যেখানে নবীজীও অংশগ্রহণ করেছিলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর  (রা.) কর্তৃক কাবা নির্মাণ

ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া ইসলামিক সাম্রাজ্যের আমির পদে সমাসীন হলে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রা: তার বাইয়াত অস্বীকার করে মক্কায় চলে আসেন। মক্কাবাসী তার কাছে বাইয়াত হন। মদিনা থেকেও ইয়াজিদের প্রতিনিধিকে বের করে দেয়া হয়। তা শুনে ইয়াজিদ মুসলিম ইবনে উকবা মুররিকে প্রধান করে মদিনাবাসীর বিপক্ষে যুদ্ধে করে মক্কায় আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাহিনী প্রেরণ করেন। মুসলিম অসুস্থ ছিল বিধায় ইয়াজিদ এই আদেশও দেন যে, তুমি মৃত্যবরণ করলে দায়িত্ব হুসাইন ইবনে নুমাইর আল-কিন্দিকে দেবে। মুসলিম মদিনা বিজয়ের পর মক্কার দিকে রওনা করেন। পথিমধ্যে তার অবস্থা বেগতিক হলে হুসাইনকে দায়িত্ব দেন এবং তিনি ইন্তেকাল করেন। হুসাইন ইবনে নুমাইর মক্কায় পৌঁছে বাধার সম্মুখীন হলে, জাবালে আবি কুবাইস ও জাবালে আহমারে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করে মক্কায় পাথর নিক্ষেপ করেন। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত কাবাঘরেও লাগে, যার কারণে কাবার কাপড় ছিড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। লাগাতার আক্রমণে কাবার দেয়াল দুর্বল হয়ে যায়।

আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইরের এক সৈনিক কাবার পার্শ্বেই একটি তাঁবুতে আগুন জ্বালালে সেই আগুন কাবায় লাগে এবং কাবা জ্বলে যায়। যার ফলে কাবার দেয়াল খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি ওপরের অংশ নিচে খসে খসে পড়তে থাকে। এতে মক্কা ও শামবাসী সবাই ভীত-বিহ্বল হয়ে পড়ে। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর একটি প্রতিনিধিদল হুসাইন ইবনে নুমাইরের কাছে প্রেরণ করেন। তারা তাকে বোঝান যে, আপনাদের পাথরের আঘাতের কারণে কাবার এই অবস্থা। তারা আরো বলেন, ইয়াজিদ তো ইন্তেকাল করেছেন। তোমরা বরং শামে ফেরত যাও এবং নতুন আমির মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াজিদ কি হুকুম দেন তার অপেক্ষা কর। হুসাইন ইবনে নুমাইরের বাহিনী চলে গেলে, ইবনে জুবাইর মক্কার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকেন এবং কাবা ভেঙে পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে তাদের সাথে পরামর্শ করেন। ইবনে আব্বাস তার কঠোর বিরোধিতা করেন। ইবনে জুবাইর বলেন, আল্লাহর কসম আমি আল্লাহর ঘর এমন বেহাল অবস্থায় থাকতে দিতে পারি না। শেষে কাবা ভাঙার ব্যাপারে সবাই একমত হলে, কুরাইশরা যেখান থেকে পাথর এনেছিল সেখান থেকে পাথর সংগ্রহ করা হয়। ইয়ামেনের সানা থেকে উন্নতমানের সুড়কি-প্লাস্টার, জিপসাম আনা হয়। কাবা ভাঙার আগে মক্কাবাসী মক্কা থেকে বের হয়ে যায় এবং তিন দিন বাইরে থাকেন আজাবের ভয়ে।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ (রা.)  কর্তৃক কাবা নির্মাণ

আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ইসলামিক সাম্রাজ্যের খলিফা নিযুক্ত হলে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে মক্কায় নিযুক্ত করেন। ইবনে জুবাইরের সাথে যুদ্ধ হলে, হাজ্জাজ তাকে পরাজিত করে শহীদ করে দেয়। মক্কায় প্রবেশ করে সে আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের কাছে লিখে পাঠান, ইবনে জুবাইর কাবায় এমন কিছু সংযোজন করেছেন, যা আগে ছিল না এবং নতুন একটি দরজা বানিয়েছে। আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান তাকে লিখে পাঠান যে, নতুন দরজাটি যেন বন্ধ করে দেয়া হয়। হাতিমের অংশটি যেন ভেঙে দেয়া হয় এবং সব কিছু যেন আগের মতো করা হয়। হাজ্জাজ পুনরায় কাবা ভেঙে কুরাইশদের মতো করে তৈরি করে। বর্তমানেও সেই অবস্থায়ই আছে। (ইখবারু মক্কা-২১০)